বর্ষা শেষে সেপ্টেম্বরের এক রাত। ঘন কুয়াশায় পাহাড় ডুবে আছে। বৃষ্টির শেষ সুরে পাতাগুলো টপটপ শব্দ করছে। চাঁদহীন সেই রাতে পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা কুয়াশা যেন গ্রামটাকে গিলে নেওয়ার চেষ্টা করছে। জাটিঙ্গা গ্রামে হঠাৎ এক অদ্ভুত শব্দ শোনা যায়। পাখিরা ডানা ঝাপটাচ্ছে। এক-দু’'টা নয়, কমপক্ষে কয়েকশো। মুহূর্তের মধ্যে ঘরের ছাদ, বাঁশের বেড়া, মাটির ওপর বিভিন্ন জায়গায় তারা মরে পড়ে থাকে! যেন আত্মহত্যা!
এই কাহিনীর সূচনা ১৯০৫ সালে। ভারতের আসামের ছোট একটা পাহাড়ি গ্রাম জাটিঙ্গা। তখন সেখানে বসবাস করত একদল নাগা উপজাতি। সেবছর বর্ষার এক অমাবস্যা রাতে, কয়েকজন নাগা একটা হারিয়ে যাওয়া মোষের খোঁজে বের হয়েছিল। তাদের হাতে জ্বলছিল মশাল, হালকা কমলা আলোয় দুলছিল পাহাড়ের ছায়া। বরাইল পর্বতশ্রেণির জাটিঙ্গা শৃঙ্গের কাছে পৌঁছতেই হঠাৎ আকাশ যেন ফেটে পড়ল। একের পর এক পাখির দেহ তাদের ওপর ঝরে পড়তে লাগল; মৃত, আহত, দিশেহারা, যেন কোনো অশুভ বৃষ্টি। ভয়ে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো ভাবল এ নিশ্চয়ই আত্মার অভিশাপ। এ ভয়ের কাহিনী ছড়িয়ে গেল পাহাড়ে, কুয়াশায়, প্রবল বৃষ্টির শোঁ শোঁ শব্দে।
পরবর্তীতে ১৯১০ সালে জানা যায় জাটিঙ্গায় পাখির মৃত্যু ঘটে শুধু সেপ্টেম্বর–অক্টোবরের রাতগুলোতে। আরো নির্দিষ্ট কর বললে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত সাড়ে নয়টার মধ্যে। যেন সময়ের ভেতর বন্দি প্রকৃতির কোনো নিজস্ব ক্যালেন্ডার।
তবে এই অদ্ভুত ঘটনা বছরের পর বছর স্থানীয়দের কানে কানে ছড়িয়ে থাকলেও—বিশ্বের সামনে আসে ১৯৫৭ সালে। একজন ব্রিটিশ চা ব্যবসায়ী ও পাখি বিশারদ ই. পি. গি ঘটনাটা শুনে জাটিঙ্গায় আসেন পাখিদের এই অদ্ভুত আচরণ নিয়ে গবেষণা করতে। তিনি এটাকে পাখির আত্মহত্যা নয়, বরং বিভ্রান্তির ফল বলেই উল্লেখ করেন। গবেষণায় দেখা যায় শুধু বর্ষা শেষে, যখন মেঘলা আকাশ ও কুয়াশা মিলে যায়, আর বাতাসে আর্দ্রতা বাড়ে, তখনই এই ঘটনা ঘটে।
দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ শেষে তিনি The Wildlife of India নামক একটা বই লিখেন। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো পৃথিবী জাটিঙ্গার রহস্যের কথা জানতে পারে।
যুগের পর যুগ এই রহস্যকে ঘিরে গড়ে উঠেছে কিংবদন্তি। কেউ বলে, এ গ্রাম অভিশপ্ত। কেউবা দাবি করে, পাহাড়ি দেবতা পাখিদের আত্মা টেনে নেয়।
১৯৭৭ সালে জুওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া এই অদ্ভুত গ্রামের রহস্য উন্মোচনে কাউকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। আর সেই দায়িত্ব এসে পড়ে সুধীন সেনগুপ্তর কাঁধে। তিনি লক্ষ্য করেন কুয়াশা আর বৃষ্টির ক্ষুদ্র ফোঁটায় আলো পড়লে এক অদ্ভুত বিভ্রম তৈরি হয়। সেই বিভ্রম যেন আকাশের পথ হারানো পাখিদের মস্তিষ্কে এক অচেনা সংকেত পাঠায়। কিন্তু আরও রহস্যময় ছিল একটা বিষয়, প্রতিটা আহত পাখিই প্রায় তিন ঘণ্টা আগে শেষবার খাবার খেয়েছিল।
বহু মাস, বহু মৌসুম তাকে ও তার দলকে গ্রামটা খুঁটিয়ে দেখতে হয়েছে। অসংখ্য আচরণগত তথ্য, বৃষ্টির ঘনত্ব, আলোর উৎস সব নথিভুক্ত হয়েছে। তবু কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে মানুষের বোধের বাইরে।
কেন কেবল জাটিঙ্গার ১.৫ কিলোমিটার লম্বা আর ২০০ মিটার চওড়া সরু উপত্যকার মাঝেই ঘটে এই মৃত্যুযজ্ঞ? আর কেনই বা ক্ষুধার্ত অবস্থায় এই আচরণ? উত্তর—আজও নেই।
বর্তমানে জাটিঙ্গায় ২৫০০ মানুষের বসবাস। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭৩০ মিটার উঁচু, পাহাড়ের বুকের ওপর বসে থাকা এই ছোট্ট গ্রাম আজও প্রতি বছর কয়েকটা অমাবস্যা জুড়ে তার রহস্যের পর্দা সরিয়ে দেখায় মৃত্যুর মিছিল। কিন্তু এ রহস্য আজো অমীমাংসিত। মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে বিস্ময়ে, কিন্তু প্রকৃতির কিছু বিষয় যেন আজীবনই তার কাছে গোপন থেকে যায়।
