১৯৯৭ সালের মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ। ক্যালিফোর্নিয়ার বিলাসবহুল এলাকা র্যাঞ্চো সান্তা ফে-এর একটা বাড়ি হঠাৎই যেনো নিঃশব্দতার কালো ছায়ায় ঢেকে যায়। প্রতিবেশীরা কয়েকদিন ধরে লক্ষ্য করছিলেন ভেতরের ঘরগুলো থেকে কোনো সাধারণ শব্দ, চলাফেরা বা দৈনন্দিন জীবনের চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল না। নিঃশব্দ বাড়ির প্রতিটা জানালা যেন রহস্যের আভাস নিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে, যা তাদের উদ্বেগের পরিমাণ আরো বাড়িয়ে দেয়।
এক পর্যায়ে খবর পেয়ে পুলিশের তদন্তকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। দরজা খোলার পর প্রথমেই চোখে পড়ে এক দল মানুষ শান্তভাবে বসে বা শুয়ে আছে। ৩৯ জনের এই দলের প্রত্যেকের গায়ে জড়ানো ইউনিফর্মের মতো একই ধরনের কালো রঙের পোশাক, পায়ে নতুন কালো নাইকি জুতা, বাহুতে “হেভেন’স গেইট অ্যাওয়ে টিম” লেখা ব্যাজ। তদন্তকারীরা প্রতিবেশীদের সাক্ষাৎকার এবং পুলিশ রিপোর্ট মিলিয়ে নিশ্চিত হয় এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়। বরং, পুরোটাই একটা পূর্বপরিকল্পিত ঘটনার অংশ।
তদন্ত এগোতে থাকলে পুলিশ দলের ওয়েবসাইট এবং তাদের লিডারের পুরোনো ভিডিও ক্লিপ পায়। সেগুলো বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া যায়, এরা সবাই একটা গোপনীয় এবং রহস্যময় কাল্ট— হেভেন’স গেইট-এর সদস্য। দলটার নেতৃত্বে ছিলেন মার্শাল অ্যাপলহোয়াইট ও বনি নেটলস, যাদের অনুসারীরা “ডো” এবং “টি” নামে ডাকত।
হেভেন’স গেইট কাল্টটা ১৯৭০-এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হয়। তারা আত্মার উন্নতি এবং মহাকাশের “উচ্চতর জীবন” সম্পর্কিত বিশ্বাস প্রচার করতেন। খুব দ্রুতই এই কাল্টের সদস্যদের যাত্রা মোড় নেয় বিপজ্জনক অন্ধ বিশ্বাসের পথে। অনুসারীরা শহর-গ্রাম ছেড়ে চলে যায় নির্জনতায়; নিজেদের পরিচয় বদলে ফেলে; পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে। শুরুতে কেউ কেউ পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখলেও পরবর্তীতে সেটাও নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়।
এই দলের নেতা সদস্যদের মনোজগতে এমনভাবে দখল নিতে সক্ষম হন যে সাধারণ মানবজীবনের ধারণাটাই তাদের কাছে অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার, শেষ পর্যন্ত তারা নিজেদের মানব নয়, বরং ভিনগ্রহের বা এলিয়েন ভাবতে শুরু করে।
তাদের দাবি ছিল— পৃথিবী খুব তাড়াতাড়ি “রিসাইকেল” হবে। তাই পৃথিবী ত্যাগ করলেই পৌঁছানো যাবে পরবর্তী গন্তব্য বা “নেক্সট লেভেল”-এ। যা হবে এক উচ্চতর মহাজাগতিক সভ্যতা, যেখানে অপেক্ষা করছে নতুন অস্তিত্ব। ঠিক যেভাবে হয়েছিল যীশু খ্রিষ্টের অন্তর্ধান। আর সেখানে পৌঁছাতে হলে মানবদেহ নামক “কন্টেইনার” বা খোলস থেকে বের হতে হবে আত্মাকে। এই বিশ্বাসকে আরো দৃঢ় করতে সদস্যদের খাদ্যাভ্যাস থেকে শুরু করে পুরো জীবনব্যবস্থাকেই নিয়ন্ত্রণ করা হতো, যেন তারা নিজেদের স্বকীয় অনুভূতি থেকে বেরিয়ে এসে দলীয় অনুভূতিতে বিশ্বাস করতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
তাদের এই বিশ্বাসকে বিস্ফোরণের মতো উসকে দেয় ১৯৯৭ সালের হেল-বপ ধূমকেতুর আবির্ভাব। সময়টা ছিল ইন্টারনেটের একদম শুরুর দিক। গুজব তখন চোখের পলকেই ছড়িয়ে পড়ত। এর মাঝেই এক অপেশাদার অ্যাস্ট্রোনোমার দাবি করেন, “ধূমকেতুর লেজের ঠিক পেছনে যেনো কিছু ছুটছে… মনে হচ্ছে কোনো স্পেসক্রাফট!”

কিন্তু হেভেন’স গেইট-এর লিডার মার্শাল অ্যাপলহোয়াইট এটা দেখলেন এক অন্য চোখে। এই “ক্রাফট”-কে তারা বিশ্বাস করতে শুরু করল তাদেরকে “হায়ার কিংডম”-এ নিয়ে যাওয়ার মহাজাগতিক যান হিসেবে।
তাদের ভিডিওগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৯৭ সালের মার্চ মাসের শুরুর দিনগুলোতে রাত পড়তেই র্যাঞ্চো সান্তা ফে-এর বাড়িটার ভেতরের পরিবেশ বদলে যেত। পর্দা টানা জানালার ফাঁক দিয়ে ধূমকেতুর একটা সাদা-নীল রেখা দেখা যেত। সদস্যরা তাকে ডাকত “সিগন্যাল ইন দ্য স্কাই”।
রাতের দিকে মার্শাল অ্যাপলহোয়াইট ছোট একটা ঘরে সবাইকে জড়ো করে বলতেন, “ধূমকেতু এখন কাছাকাছি, আমাদের ক্রাফট প্রস্তুত।” সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি দিত। তাদের মধ্যে ভয় ছিল না। বরং একধরনের উত্তেজনা ছিল, যেন বহু প্রতীক্ষিত যাত্রার টিকিট হাতে পেয়েছে।
শেষ কয়েকদিনে হেভেন’স গেইট-এর সদস্যরা প্রস্তুতির অংশ হিসেবে “এক্সিট স্টেটমেন্টস” ভিডিও করেছিল। সেখানে কেউ বলছে— “আই’ম রেডি ফর দ্য নেক্সট লেভেল।” আবার কেউ বলছে— “দিস ইজ দ্য হ্যাপিয়েস্ট মোমেন্ট অব মাই এক্সিস্টেন্স।” এমনকি এক রাতে তারা একটা “ডিপার্চার রিহার্সাল”-ও করে ফেলে।
সেই অনুযায়ী তাদের জীবনের শেষ রাতটা যেনো অন্যরকম এক নীরবতায় ঢেকে গেল। আগেই ঠিক করা হয়েছিল, সেদিনই শুরু হবে তাদের “এক্সিট সিকোয়েন্স”। সবাইকে ভাগ করা হবে ছোট ছোট দলে। একদল পৃথিবী ত্যাগ করলে, পরের দল তাদের সযত্নে বেগুনি কাপড়ে ঢেকে দেবে। এভাবে তিনটা দলে ভাগ হয়ে তারা এ কাজ করতে থাকে। যারা শেষ পর্যন্ত টিকে ছিল, তাদের কাউকে বাকি সবার মতো কাপড়ে ঢেকে দেওয়ার মতো আর কেউ ছিল না। তাই তারা নিজেরাই নিজেদের অবস্থান ঠিক করে নেয়।
এইভাবে তিন ধাপে সম্পন্ন হয় এমন এক আত্মাহুতি, যা আজও বিশ্বের সবচেয়ে সমন্বিত ও রহস্যময় গণ-আত্মহত্যাগুলোর একটা হিসেবে বিবেচিত।
হেভেন’স গেইট কাল্টের ঘটনার পর এটা নিয়ে বহু বই, চলচ্চিত্র ও পডকাস্ট তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ২০২০ সালে এইচবিও ম্যাক্স নির্মিত চার পর্বের “হেভেন’স গেইট: দ্য কাল্ট অব কাল্টস” ডকুসিরিজটা সবচেয়ে ব্যাপক ও নির্ভরযোগ্য ডকুমেন্টেশন হিসেবে বিবেচিত হয়, যেখানে কাল্টের প্রাক্তন সদস্য এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের মূল্যবান সাক্ষাৎকারও ছিল।
শুনতে গল্পের মতো মনে হলেও, এটা কোনো গল্প নয়। হেভেন’স গেইট-এর এই ভয়ঙ্কর সমাপ্তি আমাদের মনে করিয়ে দেয়— মানুষ যখন নিজের বিচারবুদ্ধি অন্যের হাতে সমর্পণ করে, তখন সেটাই হয়ে উঠতে পারে তার ধ্বংসের কারণ।
