তারা বিজয়ী হতে ইংল্যান্ডে এসেছিল। কিন্তু শেষমেশ ঠিকানা হয় একটা গর্তে। মাথা কেটে শরীর থেকে আলাদা করে তাচ্ছিল্যের সাথে লাশ ফেলে রাখা হয়। মস্তকহীন দেহের সাথে মাটি চাপা পড়ে যায় ওদের সমস্ত গৌরব।
হাজার বছর আগে যদি কেউ ডরসেটের পাহাড়ের উপর দিয়ে হেটে যেত, তাহলে পায়ের নিচে অস্বাভাবিক কিছু অনুভব করত না। কেবলই মাটি আর ঘাস। সাথে মিষ্টি ঠান্ডা বাতাস। কিন্তু সেই শান্ত মাটির নিচেই লুকিয়ে আছে এক ভয়ঙ্গকর অতীত।
তারা জয়ী হতে ইংল্যান্ডে এসেছিল। তবে তাদের মাথা কেটে, গৌরব মাটির সাথে মিশিয়ে, মাটি চাপা দেয়া হয় একটি নীরব গুহায়।
হাজার বছর আগে যদি কেউ সেই শান্ত ডরসেট পাহাড়ের উপর দিয়ে হেঁটে যেত, তারা তাদের পায়ের নীচে অস্বাভাবিক কিছু অনুভব করত না। অনুভব করত কেবল ঘাস, মাটি, বাতাস। কিন্তু সেই মাটির নিচেই, অতীত লুকিয়ে ছিল।
২০০৯ সালে, আধুনিক রাস্তার জন্য জমি পরিষ্কার করার সময় নির্মাণ শ্রমিকরা এমন কিছু আবিষ্কার করেছিলেন, যা তাদের মেশিনগুলোর পাশাপাশি তাদের নিঃশ্বাস বন্ধ করে দিয়েছিল। একটা গুহা, প্রশস্ত এবং গভীর। ভেতরে পঞ্চাশেরও বেশি লোক। সবাই-ই তরুণ, শক্তিশালী, যোদ্ধা। কারোরই দেহের সাথে মাথা নেই।
খুলিগুলো পরিষ্কারভাবে সরিয়ে গুহার পাশে একটি পৃথক স্তূপে রাখা হয়েছিল।
সম্মানের সাথে সাজানোও নয়, সম্মানের সাথে সমাহিতও করা হয়নি। শুধু ফেলে রাখা হয়েছে, যেন মৃত্যুতেও তাদের মুখগুলোর শাস্তি শেষ হয়নি।
মৃতদেহগুলো একত্রে পড়ে ছিল, ভয়াবহ অসাবধানতার সাথে। হাত দুটো জট পাকিয়ে গেছে। পাঁজর ফেটে গেছে। হাড়গুলো অস্বাভাবিকভাবে বাঁকানো। তবুও হাড়গুলো এই মানুষদের সম্পর্কে একেবারেই আলাদা গল্প বলেছিল। তারা ছিল অভিজ্ঞ শক্তিশালী যোদ্ধা। পুরনো যুদ্ধের ক্ষত ছিল অনেকের দেহে। কারো কারো শরীরে এমন আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে যা অনেক আগেই সেরে গেছে।
এভাবে যোদ্ধাদের কে হত্যা করেছিল? আর কেনইবা তাদের মাথা নিয়ে নিয়েছিল?
ফরেনসিক দল আরও বেশ কিছু আপত্তিকর তথ্য আবিষ্কার করে। অনেক মৃতদেহের ঘাড়ে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। যা ইঙ্গিত দেয় যে, হত্যাকান্ড ঘটানো হয় অগোছালোভাবে। কিছু আঘাত মিস হয়েছে, কিছু পাশ কেটে গেছে। কিছু আঘাত এলোপাথাড়ি দিক থেকেও করা হয়। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, এটা এমন লোকদের কাজ ছিল, যারা তাড়াহুড়ো করেছিল, ভয় পাচ্ছিল, অথবা অভিজ্ঞ ছিল না।
এটি পরিষ্কার যে, সামরিক কারো হত্যাকান্ড ছিল না।
তাই ডরসেটের ময়লা থেকে প্রশ্ন এমনভাবে উঠে আসে, যেন প্রাচীন কোনো আগুনের ধোঁয়া।
এই লোকগুলোর কী হয়েছিল?
আইসোটোপ বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রথম সূত্রটি থেকে জানা যায় যে, যোদ্ধারা স্থানীয় ছিলেন না। তাদের খাদ্যাভ্যাস, তাদের উৎপত্তি, তাদের দাঁত সবই এক দিকে ইশারা করছিল। স্ক্যান্ডিনেভিয়া।
তারা ছিল ভাইকিং।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক জানিয়েছে যে, এই ব্যক্তিরা সম্ভবত ধরা পড়া ডাকাত, ইংল্যান্ড উপকূলে এক ব্যর্থ আক্রমণের সময় আটক করা হয়েছিল। গার্ডিয়ান আরও জানিয়েছে যে এটি স্থানীয় স্যাক্সনদের প্রতিশোধের একটি কাজ হতে পারে, বছরের পর বছর ধরে ভাইকিংদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার এবং শহরগুলিকে আতঙ্কিত করার আক্রমণের সহিংস প্রতিক্রিয়া। কিন্তু দৃশ্যের নিষ্ঠুরতার কাছে সেই ব্যাখ্যাটিও ছোট মনে হয়।
মাথাগুলো সরিয়ে আলাদা করে স্তূপ করা হয় কেন?
হত্যাকান্ড ঘটাতে তাড়াহুড়ো কেন?
কেন কোন আচার-অনুষ্ঠানের চিহ্ন, শ্রদ্ধার চিহ্ন, এমনকি কবরের জিনিসপত্র পর্যন্ত না রেখেই চলে যাওয়া?
কিছু ঐতিহাসিকের পরামর্শ অনুযায়ী, সতর্কীকরণ হিসেবে হয়তো এই ব্যক্তিদের হত্যা করা হয়েছিল। একটি সাবধান বাণী। মাটির ভেতরে খোদাই করা একটি বার্তা। যারা এখানে লুটপাট করতে আসে, দেখো, তাদের কী হয়!
অন্যরা বিশ্বাস করেন যে, গাইড বা তথ্যদাতারা ফাঁদে ফেলে, নিরস্ত্র করে, ঘেরাও করে, এই যোদ্ধাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক দূরে ঘটানো হয়েছে এই নারকীয় হত্যাযঞ্জ!
গুহায় কোনো অস্ত্র নেই। কোনো ঢাল নেই।
তাদের মৃতদেহ ছাড়া আর কিছুই তাদের যোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত করে না। আর গুহার নীরবতা রহস্যকে আরও গভীর করে তোলে।
প্রত্নতাত্ত্বিকরা এই স্থানটিকে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাইকিং আবিষ্কারগুলির মধ্যে একটি বলে অভিহিত করেছেন। এটি সেই যুগের অন্ধকার সত্যগুলো প্রকাশ করে। উভয় পক্ষই যে ভয় বহন করেছিল। উভয় পক্ষই যে নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করতে সক্ষম ছিল। আর প্রতিটি অভিযান এবং প্রতিটি প্রতিশোধের ভেতরে যে ভয়াবহ অনিশ্চয়তা বাস করত।
ডরসেট পিট কোনও বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্র নয়।
এটা গৌরবের জায়গা নয়। এটা এমন একটা জায়গা যেখানে উচ্চাকাঙ্ক্ষা শেষ হয়ে যায়, সন্ত্রাসের সাথে সাহস নিয়ে লড়াই করার পরেও, তরুণ যোদ্ধারা বিভ্রান্তি ও ক্রোধে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
গল্পটি এখনেই থামছে না। মাটি থেকে ফিসফিস করে কথা বলতে থাকে অতীত।
এই লোকেরা কারা ছিল এবং তারা কীভাবে মারা গিয়েছিল? আর কেনই বা কেউ পৃথিবী থেকে তাদের মুখ মুছে ফেলার দরকার মনে করল?
উত্তরগুলো ডরসেটে চাপা পড়ে আছে। নীরব কিন্তু প্রতিটি কৌতূহলী দর্শনার্থীর দিকে তাকিয়ে আছে, যারা সেই শেষ মুহূর্তগুলি কল্পনা করার সাহস করে। ইতিহাসে অনেক কবর আছে। কিন্তু কোনো কোনো কবর নিজের অবস্থান জানান দিতে চায়৷ বিলীন হতে চায় না।
