খ্রিস্টাব্দ বারো শতক। ইংল্যান্ডের সাফোক কাউন্টির ছোট্ট গ্রাম উলপিট। শেষ বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হচ্ছিল। মাঠে ফসল কাটার শব্দ, বাতাসে শস্যের গন্ধ, দূরে কোথাও বাজছে গির্জার ঘণ্টা। হঠাৎ গ্রামের প্রান্তের গভীর জঙ্গল থেকে ভেসে এলো এক অদ্ভুত কান্নার শব্দ। শব্দটা এতটাই অচেনা যে কেউ প্রথমে বুঝতে পারল না সেটা মানুষ না পশু। একজন কৃষক থমকে দাঁড়াল। সে ভাবল, হয়তো শেয়াল কিংবা বেড়ালের বাচ্চা। কারণ সবাই জানত, ওই জঙ্গল মানুষের জন্য নয়। কিন্তু কাছে যেতেই তার হাতের কাস্তে মাটিতে পড়ে গেল।
জঙ্গলের ধারে দাঁড়িয়ে ছিল দু’জন শিশু। একজন ছেলে, আরেকজন মেয়ে। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। তাদের পোশাক অদ্ভুত, চোখে ভয় আর বিস্ময়ের ছায়া। কিন্তু যেটা গ্রামের মানুষকে শিউরে উঠতে বাধ্য করল, তা ছিল তাদের গায়ের রং। সম্পূর্ণ সবুজ। পাতার মতো সবুজ।
কিছুক্ষণ কেউ কথা বলতে পারেনি। পুরো গ্রাম যেন শ্বাস নিতে ভুলে গিয়েছিল।
উলপিট কখনো অলৌকিক ঘটনার জন্য পরিচিত ছিল না। তবু সেদিন গ্রামবাসীরা বুঝে গেল, তারা এমন কিছুর মুখোমুখি হয়েছে যা দৈনন্দিন বাস্তবতার বাইরে। শিশু দু’জনকে নিয়ে যাওয়া হলো স্থানীয় গ্রামপ্রধানের বাড়িতে। কথা বলার চেষ্টা করা হলো। কিন্তু সমস্যাটা দেখা দিল সেখানেই। তারা যে ভাষায় কথা বলছিল, তা কেউ বুঝতে পারল না। আবার ইংরেজিতেও তারা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না।
খিদে পেয়েছে ভেবে তাদের সামনে রুটি, মাংস, দুধসহ নানা খাবার রাখা হলো। কিন্তু তারা কিছুই স্পর্শ করল না। কোনো আগ্রহও দেখাল না। দিন কেটে গেল, তবু তাদের কিছু খাওয়ানো গেল না।
পরদিন বাড়ির বাগানে রাখা কিছু কাঁচা শিম দেখে বাচ্চা দুটো হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে ছুটে যায়। এরপর গাছ থেকে শিম টেনে এমনভাবে খেতে শুরু করে যেন বহুদিন পর পরিচিত কিছু পেয়েছে। তারা ক্ষুধার্ত পশুর মতো খাওয়া শুরু করে। আর সেদিন প্রথমবার গ্রামের মানুষ একটু স্বস্তি পায়।
বাচ্চাগুলো কয়েক মাস শুধু শিম খেয়েই কাটিয়ে দেয়। এরপর ধীরে ধীরে অন্যান্য স্বাভাবিক খাবার খাওয়া শুরু করে। তাদের শরীরের রং আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হতে শুরু করে। যেন ত্বকের সবুজ রংটা ধুয়ে যাচ্ছিল।
কয়েক মাসের মধ্যেই ছেলেটা অসুস্থ হয়ে মারা যায়। মৃত্যুর আগে তার সবুজ ত্বক ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছিল, যেন রংটা শরীর ছেড়ে চলে যাচ্ছে। একমাত্র সঙ্গী, নিজের ভাইকে হারিয়ে মেয়েটা ভেঙে পড়ে। তবু গ্রামের মানুষের যত্নে সে বেঁচে রইল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার গায়ের সবুজ রংও মিলিয়ে যেতে শুরু করল।
ক্রমে সে ইংরেজি শেখে। তারপর একদিন নিজের গল্প বলতে শুরু করে।
“আমরা এসেছি সেন্ট মার্টিনের দেশ থেকে। সেখানে কখনো পুরোপুরি সূর্য ওঠে না। চারপাশে সবসময় এক ধরনের সবুজ আলো। সবাই আমাদের মতো সবুজ রঙের।”
তার পৃথিবী ছিল চিরগোধূলির মতো, না পুরো দিন, না পুরো রাত। মেয়েটির ভাষ্যমতে, একদিন তারা গরু খুঁজতে গিয়ে ফসলের ক্ষেত পার হচ্ছিল। তখন তারা একটি গুহার ভেতর থেকে ঘণ্টার শব্দ শুনতে পায়। শব্দের টানে ভেতরে ঢুকে পড়ে। অনেক দূর হাঁটার পর হঠাৎ চোখে পড়ে তীব্র আলো। তারপর তারা নিজেদের খুঁজে পায় এক অচেনা পৃথিবীতে।
এই গল্প শুনে গ্রামবাসীরা হতবাক হয়ে যায়। মেয়েটার নির্দেশনা অনুসরণ করে জায়গাটা খুঁজতে গিয়ে তারা শুধু একটি নদীর অস্তিত্ব পায়। আর কিছু না।
গ্রামের পাদ্রীও এই গল্প শুনে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন।
এই ঘটনাটা শুধু লোকমুখে বেঁচে থাকেনি। মধ্যযুগের ইতিহাসলেখকরাও ঘটনাটি নথিভুক্ত করেছিলেন। ইংরেজ ইতিহাসবিদ উইলিয়াম অব নিউবার্গ তার হিস্টোরিয়া রেরাম এঙ্গলিকানাম [Historia Rerum Anglicarum] গ্রন্থে ১১৯৮ সালের দিকে এই রহস্যময় শিশুদের উল্লেখ করেন। পরে রালফ অব কজেশলও তার ক্রনিকন এঙ্গলিকানাম [Chronicon Anglicanum] গ্রন্থে ঘটনাটার আরেকটা বিবরণ দেন। দুই ইতিহাসকারের বর্ণনায় কিছু পার্থক্য থাকলেও মূল ঘটনাটা প্রায় একই—উলপিট গ্রামের কাছে অদ্ভুত ভাষাভাষী সবুজ বর্ণের দুই শিশুর আবির্ভাব। এই কারণেই অনেক গবেষক মনে করেন, গল্পটা নিছক লোককাহিনী হলেও এর পেছনে হয়তো কোনো বাস্তব ঘটনার ছায়া লুকিয়ে ছিল।
আধুনিক ইতিহাসবিদদের একাংশের ধারণা, শিশুরা হয়তো ফ্লেমিশ অভিবাসী ছিল, যারা যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষের সময় পথ হারিয়ে ফেলেছিল। বিশেষ করে ১১৭৩ সালের Battle of Fornham-এর পর বহু ফ্লেমিশ পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়ে। ধারণা করা হয়, সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই কিছু শিশু পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে উলপিট অঞ্চলে এসে পৌঁছায়। তাদের অচেনা ভাষা ও ভিন্ন পোশাক এই তত্ত্বকে আরও শক্তিশালী করে।
তাদের সবুজ ত্বক নিয়েও রয়েছে নানা ব্যাখ্যা। মধ্যযুগে গ্রিন সিকনেস [green sickness] নামে পরিচিত এক ধরনের শারীরিক অবস্থার উল্লেখ পাওয়া যায়, যাকে পরবর্তীতে হাইপোক্রোমিক অ্যানিমিয়া [hypochromic anemia] বা ক্লোরোসিসের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়। লৌহের ঘাটতি ও দীর্ঘ অপুষ্টির কারণে আক্রান্ত মানুষের ত্বকে ফ্যাকাশে সবুজাভ আভা দেখা দিতে পারত। ফলে কিছু গবেষকের ধারণা, শিশু দুটির অস্বাভাবিক রং হয়তো কোনো অতিপ্রাকৃত বৈশিষ্ট্য ছিল না, বরং অনাহার, দুর্বলতা ও রোগের বহিঃপ্রকাশ ছিল।
কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। রোগ হয়তো ত্বকের রং ব্যাখ্যা করতে পারে, কিন্তু তাদের রহস্যময় ভাষা, ‘সেন্ট মার্টিনের দেশ’-এর গল্প, কিংবা সেই অদ্ভুত গুহার বর্ণনা আজও পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারে না। আর সেখানেই ইতিহাস ধীরে ধীরে কিংবদন্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে।
পরে মেয়েটির নাম রাখা হয় অ্যাগনেস। সে বড় হয়। কিংস লিন শহরে এক রাজকর্মচারীকে বিয়ে করে স্বাভাবিক জীবনযাপনও শুরু করে।
ইতিহাসে কিছু ঘটনা আছে, যেগুলো সময়ের সঙ্গে ধোঁয়াশা হয়ে যায় না। বরং যত পুরোনো হয়, তত বেশি অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। উলপিট গ্রামের সবুজ বাচ্চাদের গল্প ঠিক তেমনই। এমন এক রহস্য, যাকে ব্যাখ্যা করতে গেলে যুক্তি কেঁপে ওঠে, আর অস্বীকার করতে গেলে ইতিহাস নিজেই সামনে এসে দাঁড়ায়।
