২৬ এপ্রিল, ১৯৮৬। সোভিয়েত ইউনিয়নের আকাশে চাঁদ ছিল ম্লান, বাতাসে বসন্তের নরম শিশির। শান্ত প্রিপিয়াত শহরের শিশুরা তখনও গভীর ঘুমে।
কিন্তু সেই নির্মল ঘুম ভাঙার আগেই, ভোরের আলো ফোটার ঠিক আগে, কয়েক কিলোমিটার দূরে মানবসৃষ্ট এক সূর্য বিস্ফোরিত হলো। চেরনোবিল নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টের রিয়েক্টর–৪।
ধোঁয়ার সঙ্গে আকাশে উঠতে লাগল এক অদৃশ্য আগুন, যার কোনো শিখা নেই, আছে শুধু মৃত্যুর বিকিরণ। গাছের পাতায় জমতে লাগল এক অদ্ভুত ধুলোর স্তর। কিন্তু সেটা সাধারণ ধুলো নয়, সিজিয়াম আর আয়োডিনের তেজস্ক্রিয় কণা। রিয়েক্টরের কোর তখন যেন গলিত নরকের এক টুকরো, যা নিজের ভেতরে সবকিছু টেনে নিচ্ছিল।
কিন্তু সেদিন আসলে কী ঘটেছিল?
চেরনোবিলের রিয়েক্টর–৪-এ সেই রাতে চলছিল একটা নিরাপত্তা পরীক্ষা। পরীক্ষার অংশ হিসেবে বন্ধ রাখা হয়েছিল জরুরি কুলিং সিস্টেম। ফলে রিয়েক্টরের ভেতরে অস্বাভাবিক তাপ জমতে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বুঝতে পেরে অপারেটররা দ্রুত রিয়েক্টর শাটডাউন করার চেষ্টা করেন। আর ঠিক তখনই ঘটে যায় ইতিহাসের ভয়াবহতম পারমাণবিক বিস্ফোরণগুলোর একটা।
মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে রিয়েক্টর ভবন ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। আগুন ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। রেডিয়েশনের মাত্রা পৌঁছে যায় এমন এক সীমায়, যেখানে নিঃশ্বাস নেওয়াও ছিল মৃত্যুর সূচনা।
কিন্তু সবচেয়ে বড় বিপর্যয় তখনও সামনে অপেক্ষা করছিল।
রিয়েক্টরের ঠিক নিচে ছিল বিশাল এক জলাধার, একটি বাফার পুল, যা মূলত প্ল্যান্টের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হতো। বিস্ফোরণের পর গলতে থাকা রিয়েক্টর কোর ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামছিল। আর যদি সেই গলিত কোরিয়াম পানির সংস্পর্শে আসত?
বিজ্ঞানীদের মতে, সেটা হতে পারত ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ স্টিম বিস্ফোরণগুলোর একটা।
এই বিস্ফোরণের শক্তি হিরোশিমার পারমাণবিক বিস্ফোরণের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি হতে পারত। তেজস্ক্রিয় পানি বাষ্প হয়ে আকাশে ছড়িয়ে পড়ত। চেরনোবিলের বাকি তিনটা রিয়েক্টরও ধ্বংস হয়ে যেতে পারত। ইউক্রেন, বেলারুশ, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়াসহ ইউরোপের বিশাল অংশ অনাবাসযোগ্য হয়ে যেত। কোটি মানুষের মৃত্যু, খাদ্যব্যবস্থার ধ্বংস, অর্থনৈতিক বিপর্যয়—সবকিছু একসঙ্গে নেমে আসত।
সহজ ভাষায়, ইউরোপের বিশাল অংশ স্থায়ী “ডেড জোন”-এ পরিণত হতে পারত।
এই দ্বিতীয় বিপর্যয় ঠেকানোর একমাত্র উপায় ছিল বেসমেন্টের জমে থাকা পানি বের করে দেওয়া। আর সেটার জন্য কাউকে নামতে হতো রিয়েক্টর–৪-এর ভাঙাচোরা, অন্ধকার, জলমগ্ন বেসমেন্টে, যেখানে প্রতিটা মুহূর্ত ছিল অদৃশ্য মৃত্যুর ভেতর হাঁটা।
কিন্তু কে যাবে সেখানে?
কে নিজের জীবন হাতে নিয়ে সেই মৃত্যুঘরে ঢুকবে?
ঠিক তখনই এগিয়ে এলেন তিনজন মানুষ—এলেক্সি আনানেনকো, ভ্যালেরি বেসপালভ এবং বোরিস বারানভ।
তারা ছিলেন প্ল্যান্টের সাধারণ কর্মী। কেউ তাদের বাধ্য করেনি। তারা জানতেন, সেখানে ঢোকা মানে হয়তো আর জীবিত ফিরে না আসা। তবু তারা রাজি হয়েছিলেন। দায়িত্ববোধ, ভয়াবহ বাস্তবতা, আর অসংখ্য মানুষের ভবিষ্যতের কথা ভেবে। ওয়েটস্যুট পরে তারা নেমে গেলেন বেসমেন্টে। চারদিকে হাঁটুসমান কালো পানি। ভাঙা পাইপ। ছড়িয়ে থাকা ধাতব কাঠামো। আর অদৃশ্য রেডিয়েশনের বিষাক্ত উপস্থিতি।

কিছুক্ষণ পর তাদের টর্চও নিভে যায়। পুরো করিডর ডুবে যায় অন্ধকারে। তবু তারা থামেননি। দেয়ালের পাইপ ছুঁয়ে ছুঁয়ে এগিয়ে গেছেন। কারণ তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল শুধু একটা দেশ নয়, হয়তো পুরো ইউরোপের ভবিষ্যৎ।
অবশেষে তারা খুঁজে পান সেই ভালভ।
দু’জন মিলে সেটি ঘুরিয়ে দেন। তারপর শোনা যায় প্রবল গর্জনের শব্দ। বহু বছর পরে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আনানেনকো বলেছিলেন, “আমরা ট্যাংক থেকে পানি বেরিয়ে যাওয়ার গর্জন শুনতে পাচ্ছিলাম…”
ধীরে ধীরে বেসমেন্টের পানি বের হতে শুরু করে। আর সেই সঙ্গে থেমে যায় ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর সম্ভাব্য বিস্ফোরণগুলোর একটার কাউন্টডাউন।
পরবর্তী বহু বছর ধরে একটি গল্প প্রচলিত ছিল—
“তিন নায়কই সেদিন আত্মাহুতি দিয়েছিলেন।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল কিছুটা ভিন্ন।
এটা মূলত সোভিয়েত যুগের অতিরঞ্জিত এক কাহিনি। সত্য হলো, আনানেনকো এবং বেসপালভ বহু বছর বেঁচে ছিলেন। বোরিস বারানভও তাৎক্ষণিকভাবে মারা যাননি; বহু বছর পরে হৃদরোগে তার মৃত্যু হয়।
তাদের শরীর অবশ্যই রেডিয়েশনের ক্ষতির শিকার হয়েছিল। কিন্তু সেদিনের মিশন তাদের তাৎক্ষণিক মৃত্যুর কারণ হয়নি।
চেরনোবিল শুধু বিস্ফোরণ, ভুল আর মৃত্যুর ইতিহাস নয়। চেরনোবিল মানে তিনজন নীরব মানুষ, যারা অন্ধকারের গভীরে নেমে গিয়ে হয়তো একটা মহাদেশকে রক্ষা করেছিলেন।
আজ আমরা যে ইউরোপকে চিনি—রোমের বিশ্ববিদ্যালয়, বার্লিনের শিল্পাঞ্চল, প্যারিসের ব্যস্ত সড়ক, পোল্যান্ডের কৃষিভূমি এসব হয়তো একদিন পরিণত হতো পরিত্যক্ত ধ্বংসস্তূপে।
তারা যদি সেই রাতে না যেতেন, ইউরোপ হয়তো আজ আগের মতো থাকত না। হয়তো ইতিহাসের মানচিত্রে শুধু একটি বাক্যই লেখা থাকত “একসময় এখানে সভ্যতা ছিল।”
কিন্তু তিনজন সাধারণ মানুষ সেই পরিণতি বদলে দিয়েছিলেন। নিজেদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়ে, তারা নেমে গিয়েছিলেন এমন এক অন্ধকারে, যেখান থেকে ফিরে আসার নিশ্চয়তা ছিল না।
আর সেই কারণেই ইতিহাস আজও তাদের মনে রাখে নীরব নায়ক হিসেবে।
