আন্দিজের বরফঢাকা পাহাড় দুলছে হালকা হাওয়ায়। মাচু পিচুর পাথুরে দেয়ালগুলো মেঘের মধ্যে ডুবে আছে। রাতের নিস্তব্ধতায় পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে ইনকা সাম্রাজ্যের এক কিশোর প্রহরী। সে অকস্মাৎ এক অদ্ভুত শব্দ শুনতে পেল। ধীরে ধীরে পাহাড়ের বুকে যেন হেঁটে আসছে অচেনা কোনো দানব। সে জানতো না যে, এই শব্দই হবে ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম ট্র্যাজেডির দূত—স্প্যানিশ কনকুইস্তাদররা, যারা ইনকাদের স্বর্ণরাজ্যকে লক্ষ্য করে এগিয়ে আসছে…
১. স্বর্ণের অভিশাপ
ইনকা সাম্রাজ্য ছিল সে সময়ে দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে সমৃদ্ধ শক্তি। জনগণ তাদের রাজাদের শ্রদ্ধা করতো সূর্যদেবতা ইন্তির সন্তান হিসেবে। সুশাসন, কৃষি, চিকিৎসা—সবকিছুতেই তারা ছিল বিস্ময়কর।
কিন্তু যখনই কোনো সভ্যতা জ্বলে ওঠে, তখনই লোভের ছায়া গাঢ় হয়। ইউরোপজুড়ে তখন স্বর্ণের জন্য পিপাসা। স্পেন থেকে আসা এক অভিযাত্রী ফ্রান্সিসকো পিজারো শুনেছিল সাগরের ওপারে এক দেশে নদীও সোনা বয়ে আনে। তার চোখের লোভ আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল।
“ঈশ্বরের নামে,” বলেছিল সে, “আমরা সোনা নেবো… আর এই সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দেবো।”
২. ভাগ্যের ফাঁদ
তখন ইনকা সাম্রাজ্যে চলছিল গৃহযুদ্ধ। দুই ভাই আতাহুয়ালপা ও হুয়াস্কার গদি নিয়ে ভয়ংকর লড়াই করছে। যুদ্ধশেষে জয়ী হয় আতাহুয়ালপা। কিন্তু সে জানতো না, এই বিজয় আসলে তার পতনের সই।
স্প্যানিশরা এসে জানালো, “আমরা শান্তির বার্তা নিয়ে এসেছি।”
ইনকারা দেখল অদ্ভুত পোশাক, চকচকে লোহার বর্ম, আর ঘোড়া—যা তারা আগে কখনও দেখেনি। তারা ঘোড়াকে ভাবল দানব। বন্দুকের শব্দ শুনে মনে হলো বজ্রপাত। সেই ভয় ইনকাদের এক বিশাল সভ্যতাকে দুর্বল করে দিল।
৩. কাজামারকার মারণ ফাঁদ
নভেম্বর, ১৫৩২, কাজামারকা শহর। স্প্যানিশদের সংখ্যা ছিল মাত্র প্রায় ১৬৮ জন, অন্যদিকে আতাহুয়ালপার সঙ্গে ছিল প্রায় ৮০,০০০ ইনকা সৈন্য, যাদের অধিকাংশই ছিল আধুনিকতার বিচারে নিরস্ত্র।
ইনকা রাজা আতাহুয়ালপা তার সৈন্যদের বাইরে রেখেই স্প্যানিশদের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। তার বিশ্বাস ছিল কয়েক ডজন বিদেশি সেই বিশাল সাম্রাজ্যের ক্ষতি কিছুতেই করতে পারবে না।
কিন্তু সভাঘর ছিল এক ভয়াল ফাঁদ। একজন স্প্যানিশ পুরোহিত তাকে বাইবেল ধরিয়ে বলল, “এটাই সত্যের বই। এটাকে মানো, আমাদের ধর্ম গ্রহণ করো!”
আতাহুয়ালপা অবাক হয়ে ওই বইটা ঘ্রাণ নিল, কানে ধরল, কিছু শুনতে না পেয়ে অবজ্ঞাভরে বইটা মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন।
আর তখনই আকাশভেদী চিৎকার—“আক্রমণ!”
দরজা বন্ধ। স্প্যানিশরা নিয়ে এসেছিল ঘোড়া, ইস্পাতের বর্ম, বন্দুক, কামান ও তলোয়ার—যা ইনকারা আগে কখনও দেখেনি।
অতঃপর বন্দুক গর্জে উঠল, কামান কাঁপালো মাটি। ঘোড়ায় আরোহীরা ঢুকে পড়ল জনতার ভিড়ে। ধাতব বর্মে মোড়া শত্রুরা ইনকা সৈন্যদের কেটে ফেলতে লাগল।
ইনকাদের হাতে অস্ত্র ছিল, কিন্তু লোহার বর্ম ভেদ করার মতো শক্তি ছিল না। প্রায় লাখখানেক ইনকা সৈন্য পরাজিত হলো মাত্র ১৬৮ জন স্প্যানিশ সৈন্যের কাছে।
আতাহুয়ালপা নির্বাক, হতভম্ব, এবং সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয়—এমন পরিস্থিতিতে সে বন্দি।
এক মুহূর্তে অসহায় কয়েদিতে পরিণত হলেন ইনকাদের মহাবীর রাজা।
৪. সোনার ঘর আর প্রতারণা
ইনকা রাজা আতাহুয়ালপাকে মুক্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে পিজারো শর্ত দিল, “তোমার মুক্তির মূল্য দাও।”
আতাহুয়ালপা এক বিশাল কক্ষে হাত তুলে বললেন, “এই ঘরটাকে ছাদ পর্যন্ত সোনায় ভরবো, আর পাশের দুই ঘর রুপায়।” ইনকারা পাহাড় কেটে সোনা এনে ঘর ভরিয়ে দিল। দেবালয়ের মূর্তি, শিল্প, ইতিহাস—সব গলিয়ে সোনার বারে পরিণত হলো। কিন্তু ভাগ্যের শিকল কেউ ভাঙতে পারল না। স্বর্ণলালসায় পাগল স্প্যানিশরা স্বর্ণ পেল, কিন্তু রাজাকে দিল দড়ির বিচার।
৫. শেষ নিঃশ্বাসের রাজ্য
১৫৩৩ সালে আতাহুয়ালপাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হলো। সেই দিন থেকে মূলত সূর্যের সন্তানদের আলো নিভতে শুরু করল। স্প্যানিশরা দখল করল রাজধানী কুসকো। মন্দির ভাঙ্গল, সোনা লুট করল, মানুষ ধরে দাস বানাল। আতাহুয়ালপার দেহ পুড়িয়ে ফেলা হলো।
স্প্যানিশদের দ্বারা ইনকা রাজাকে হত্যা ও রাজধানী কুসকো দখলের পরও ইনকাদের বিপর্যয় থামল না।
স্প্যানিশ খড়গের চেয়ে ভয়ংকর হয়ে এলো ইউরোপীয় রোগ—গুটি বসন্ত। ইনকারা এই রোগের সঙ্গে আগে কখনও মোকাবিলা করেনি, তাই তাদের রোগ প্রতিরোধশক্তি ছিল প্রায় শূন্য। অচিরেই এটি মহামারির রূপে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে যুদ্ধ ছাড়াই মারা যায় অসংখ্য মানুষ। গ্রামগুলো উজাড় হয়ে যায়, সৈন্যশিবির খালি হয়ে পড়ে।
এই রোগ স্প্যানিশদের জন্য শাপেবর হয়ে এসেছিল। এটা প্রমাণ করল যে, ধ্বংস কেবল অস্ত্র দিয়ে হয় না, অদৃশ্য রোগও সভ্যতা ধ্বংস করতে পারে। ইনকারা, যারা সূর্যকে দেবতা মনে করত, তাদের সাম্রাজ্য অবশেষে নীরব, মৃত্যুময় ছায়ায় ঢেকে গেল।
৬. বিজয়ের গল্প নয়, প্রতারণার ইতিহাস
ইনকা সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়েছিল যুদ্ধে নয়—প্রতারণায়, লোভে, আর বিশ্বাসঘাতকতায়। মহিমান্বিত সড়ক, সেচব্যবস্থা, চিকিৎসা—সবকিছু এক সময় ভেঙ্গে পড়ে । এক বিশাল সাম্রাজ্য শেষ হয়ে যায় স্প্যানিশদের স্বর্ণের লোভে। আজও মাচু পিচু নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু ইতিহাসে বিলিন হয়ে গিয়েছে তার জনগণ।
