১৯৯৯ সালের এক বিকেল। হাড় কাঁপানো শীতের মাঝে আর্জেন্টিনার এক উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় একদল গবেষক বরফের নিচে কিছু খুড়ছে। হঠাৎ এক দৃশ্য তাদের কাঁপিয়ে দিলো। একটা নিঃশব্দ শিশু মুখ, বরফের স্তরের ভেতর ঘুমিয়ে আছে। কয়েক ঘণ্টা পর আবিষ্কার হলো আরও দুই শিশু। তারা সবাই নিখুঁত অবস্থায় সংরক্ষিত। ঠোঁটে প্রশান্তি, শরীরে রাজকীয় পোশাক, মাথায় সোনার অলঙ্কার।

কে তারা? কেন এই দুর্গম উচুঁ পাহাড়ে ঘুমাচ্ছে?
কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি, বাচ্চাগুলা কোনো রোগের শিকারেও মারা যায়নি। বরং তারা ৫০০ বছরের পুরোনো এক অদ্ভুত রোমহষর্ক ঘটনার সাক্ষী।
কাপাকোচা (capacocha) নামক এক বিশেষ রীতি অনুযায়ী অভিজাত পরিবার অথবা ইনকাদের হাতে পরাজিত উপজাতিদের ছেলেমেয়েদের মধ্যে থেকে সুস্থ, সুন্দর ছেলে-মেয়েদের বাছাই করা হতো। তাদেরকে ভাবা হতো “দেবতার প্রিয় সন্তান”। কাজেই ওদের রাজকীয় যত্নে রাখা হতো সোনার গয়না, সেরা খাদ্য, সঙ্গীত, নাচ, আর পূজার উৎসব ইত্যাদির মাধ্যমে। তারপর একদিন সেই শিশুদের নিয়ে যাওয়া হতো বরফে ঢাকা উঁচু পর্বতের চূড়ায়। তাদেরকে চিচা(cica) নামক এক ধরনের পানীয় পান করানো হতো যাতে তারা ঘুমিয়ে পড়ে। এরপর জীবন্ত অবস্হায় বরফের নিচে কবর রেখে দেওয়া হতো। যদিও কাপাকোচা (capacocha) নামের এই প্রথা কোনো পৈশাচিক উন্মাদনা থেকে জন্মায়নি ,বরং এটা ছিল ইনকাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যবস্হার একটা অংশ। তাদের বিশ্বাস ছিলো এভাবে বলি দেওয়ার পরে সেই শিশুরা দেবতার কাছে অনন্তঘুমে পৌঁছে যাবে আর এটা মৃত্যু নয়, বরং দেবতাদের অভিষেক। একসময় সেই শিশুদের আত্মা দেবতায় পরিণত হয়ে পুরো সম্প্রদায়কে রক্ষা করবে। দেবতাদের সন্তুষ্ট করলে সাম্রাজ্য শক্তিশালী হবে এবং প্রকৃতি তাদের সহায় অনুকূলে থাকবে। তারা ভাবতো বলি দেওয়া শিশুরা পবিত্র এবং অমর হবে, আর তাদের আত্মা সরাসরি সূর্যদেবতার কাছে পৌঁছে জনগণের জন্য আশীর্বাদ বয়ে আনবে। কৃষি উৎপাদন বাড়বে, রোগ-ব্যাধি কমবে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। বিশেষ করে আন্দিজ পর্বতের কঠিন পরিবেশে তুষারঝড়, খরা, ভূমিকম্প আর আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত কমবে।

তবে সব বাচ্চাদের ভাগ্যে আনন্দের মৃত্যু ছিলো না। জানা যায় কাউকে মারা হয়েছিল মাথায় জোরে আঘাত করে, আবার কাউকে পেছন দিক থেকে বুক ছিদ্র করে! আপাতদৃষ্টিতে এটা নিষ্ঠুর হলেও ইনকাদের চোখে এটা ছিলো বৃহত্তম সম্মান! বাচ্চাগুলোর মা-বাবাদেরকে সবাই সম্মান করতো আর তাদের সন্তানদেরকে বছরের পর বছর স্মরণ করা হতো। এতে করে সেই পিতা-মাতারা গর্বীত অনূভব করতো।
নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ইনকাদের এই বলি প্রথা কিন্তু তাদের শেষ রক্ষা করেনি। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, সব সভ্যতাই একদিন ধব্ংস হয়। আন্দিজ পর্বতমালা জুড়ে বিস্তৃত দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম শক্তিধর ইনকাদেরকে স্প্যানিশ আক্রমণ, রোগ, লুটপাট, সামাজিক অবনতি চূড়ান্তভাবে ধ্বংস করেছিলো। যে পর্বতমালায় একসময় শিশুদের বলি দিলে দেবতা তুষ্ট হয় ভাবা হতো সে পর্বতমালা থেকে ক্ষয়ে যায় দেবতার সন্তানদের স্মৃতি। পাহাড়-ঢাকা নগরী ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় মেঘের আড়ালে, ইতিহাসের ধুলোর নিচে। ইনকা সাম্রাজ্যের পতন ছিল ঠিক তেমনই নির্মম যেমনটা ছিলো তাদের বলিপ্রথায় শিকার হওয়া সেই শিশুদের মৃত্যু।
