স্বাধীন ইচ্ছা আমাদের কাছে এক চূড়ান্ত সত্যের মতো মনে হয়। কখন চলব, কীসে ভয় পাব, কোন পথে যাব সবই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু প্রকৃতির ভেতরে এই নিশ্চিত ধারণাটা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে।
এখানে এমন কিছু অণুজীব আছে, যাদের খালি চোখে দেখা যায় না, অথচ তারা প্রবৃত্তিকে পুনর্গঠন করতে পারে, আত্মরক্ষার বোধকে নিঃশব্দে মুছে দিতে পারে, আর জীবকে পরিণত করতে পারে এক ধরনের জীবন্ত যন্ত্রে।
তারা আক্রমণ করে না, ধাওয়া করে না, শুধু আচরণ বদলে দেয়। এটা কোনো কল্পকাহিনী নয় বরং জীববিজ্ঞানের বাস্তবতা।
এই পরজীবীরা তাদের আশ্রয়দাতাকে সরাসরি জোর করে কিছু করায় না। তারা আরও ভয়ংকর কিছু করে—মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে। শিকার অনেক সময়ই বুঝতেই পারে না যে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। সবকিছু তার কাছে স্বাভাবিক বলেই মনে হয়।
এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ শুরু হয় এক ভয়ের গন্ধ দিয়ে।
বিড়াল ইঁদুরের প্রাকৃতিক শিকারি। বিবর্তনের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় ইঁদুরের মস্তিষ্ক এমনভাবে গঠিত হয়েছে যে, বিড়ালের প্রস্রাবের সামান্য গন্ধই তার মধ্যে তীব্র ভয় তৈরি করে। কিন্তু যখন ইঁদুর Toxoplasma gondii নামের এক অতি সূক্ষ্ম পরজীবীতে আক্রান্ত হয়, তখন সেই ভয় ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
গন্ধ তখন আর বিপদের সংকেত থাকে না, কখনো কখনো তা হয়ে ওঠে অদ্ভুতভাবে আকর্ষণীয়। ইঁদুর পালায় না, বরং কাছে চলে আসে। পরিণতি পূর্বনির্ধারিত: সে বিড়ালের শিকার হয়, আর পরজীবী পৌঁছে যায় তার বংশবিস্তারের জায়গায়।
ইঁদুরের মস্তিষ্কে Toxoplasma gondii ভয়, স্মৃতি এবং ঝুঁকি বিশ্লেষণের সাথে যুক্ত অংশে সিস্ট তৈরি করে। এটি ডোপামিন সিগন্যালিংকে সূক্ষ্মভাবে প্রভাবিত করে, ফলে বিপদ বোঝার প্রক্রিয়া বদলে যায়। ইঁদুর বুদ্ধি হারায় না বরং হারায় নিজের সতর্কতা।
আর এখানেই সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্যটি লুকিয়ে আছে, ইঁদুর বিশ্বাস করে সিদ্ধান্তটা তার নিজের ছিল।
এই ধরণটি প্রকৃতিতে বারবার ফিরে আসে। উষ্ণমণ্ডলীয় অরণ্যে পিঁপড়েরা হঠাৎ করেই কলোনি ছেড়ে বেরিয়ে যায়। তারা গাছে উঠে নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছে পাতার শিরায় চোয়াল আটকে দেয়। তারপর তারা সেখানেই স্থির হয়ে থাকে মৃত্যু পর্যন্ত। কিছু সময় পর তাদের দেহ ভেদ করে বেরিয়ে আসে এক ডাঁটা, যা নিচে থাকা পিঁপড়েদের ওপর স্পোর ছড়িয়ে দেয়।
এর পেছনে থাকে Ophiocordyceps unilateralis নামের পরজীবী ছত্রাক। এটি শরীরের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে এবং রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে নেয়। এটি মস্তিষ্ক ধ্বংস করে না কিন্তু তাকে পুনর্নির্দেশ করে। পিঁপড়ে হয়ে ওঠে ছত্রাকের বাহন। বিজ্ঞানীরা একে বলেন “extended phenotype” অর্থাৎ পরজীবীর জিন প্রকাশ পায় অন্য প্রাণীর আচরণের মাধ্যমে।
পিঁপড়ে প্রতিরোধ করে না। আসলে সে পারে না।
আরও এক পরজীবী নিয়ন্ত্রণ করে আরও নিখুঁতভাবে।

হেয়ারওয়ার্ম বা চুলকৃমি ঝিঁঝিঁ পোকা ও ঘাসফড়িংয়ের শরীরে বিকাশ লাভ করে। ছোট অবস্থায় তারা লুকিয়ে থাকে, কিন্তু পরিণত হলে তাদের দরকার হয় পানি , যেখানে তারা বংশবিস্তার করবে। অথচ তাদের আশ্রয়দাতা থাকে স্থলে। এই সমস্যার সমাধান হয় আচরণগত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে।
পরজীবী স্নায়ুতন্ত্রে এমন পরিবর্তন আনে যে, পানির দিকে অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ তৈরি হয়। পোকাটি পানিতে ঝাঁপ দেয় এবং ডুবে মারা যায়। তখনই হেয়ারওয়ার্ম জীবিত অবস্থায় সাঁতার কেটে বেরিয়ে আসে।
পোকাটি কখনোই বুঝতে পারে না কেন সে পানিতে গিয়েছিল।
মাছও এই নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত নয়। Schistocephalus solidus নামের পরজীবী ছোট মিঠাপানির মাছের শরীরে বৃদ্ধি পায়। পরিণত হওয়ার সাথে সাথে মাছের আচরণ বদলে যায়, তারা পানির ওপরের দিকে যায়, বিপদের প্রতি উদাসীন হয়ে পড়ে, এবং সহজ শিকারে পরিণত হয়। পাখিরা তাদের খেয়ে ফেলে। আর পাখির শরীরেই সম্পূর্ণ হয় পরজীবীর জীবনচক্র।
প্রতিটি আচরণগত পরিবর্তন পরজীবীর পক্ষে কাজ করে মোটেও আশ্রয়দাতার পক্ষে নয়।
সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয় হলো এর বিরলতা নয় বরং এর পুনরাবৃত্তি। বিবর্তন বারবার একই সমাধানে পৌঁছে যায়: যদি শক্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না হয়, তাহলে সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করো।
এখানেই আসে এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন।
মানুষের ক্ষেত্রে কী ঘটে?
বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ Toxoplasma gondii দ্বারা আক্রান্ত বলে ধারণা করা হয়। অধিকাংশের ক্ষেত্রে কোনো স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। কিন্তু গবেষণায় কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে—ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা, প্রতিক্রিয়ার গতি, এবং আবেগপ্রবণ আচরণে পরিবর্তন। এর মানে এই নয় যে পরজীবী মানুষকে ইঁদুরের মতো নিয়ন্ত্রণ করে। তবে এটি সেই আরামদায়ক বিশ্বাসে প্রশ্ন তোলে,
যে বিশ্বাস বলে, মন সম্পূর্ণ স্বাধীন।
আচরণ পরিবর্তনকারী পরজীবীরা এক গভীর জৈব সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে—যা একই সঙ্গে বৈজ্ঞানিক এবং দার্শনিক।
স্বাধীন ইচ্ছা আছে, কিন্তু তা একটি দেহের ভেতরে কাজ করে তবে সেই দেহকে প্রভাবিত করা সম্ভব।
নিয়ন্ত্রণ সবসময় জোর করে আসে না। কখনো কখনো তা আসে নিঃশব্দে—রাসায়নিকভাবে, অদৃশ্যভাবে, ধীরে। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় এটা নয় যে প্রাণীরা নিয়ন্ত্রণ হারায়। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, তারা কখনোই বুঝতে পারে না, ঠিক কখন সেটা ঘটে গেছে।
