ইউরোপের আকাশ তখন উত্তেজনায় ভারী। সাম্রাজ্যগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিভিন্ন সামরিক জোট আর জাতীয়তাবাদের উত্থানে পুরো মহাদেশ এক আগুনের অপেক্ষায়। সেই সময়ে আলোচনায় উঠে আসেন অস্ট্রো-হাঙ্গেরির যুবরাজ আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ। বিভিন্ন চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর চোখে ছিল তার উপর। ১৯১৪ সালের এক রৌদ্রজ্জল দিনে তিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে বসনিয়ার সারায়েভো শহরে সফর করছিলেন। একটা সবুজ গ্রাফ অ্যান্ড স্টিফ্ট গাড়িতে চড়া অবস্থায় এক সন্ত্রাসী তদের গাড়ির দিকে বোমা ছুড়ে মারে। কিন্তু বোমাটা গাড়ির পিছনে পড়ে উড়ে যায় এবং এতে ফ্রাঞ্জ এর কিছু না হলেও পিছনের গাড়িতে থাকা তার অন্যান্য সহচররা আহত হয়। [১] এই ঘটনায় ফার্দিনান্দ হতভম্ব হয়ে যান, তবে তারপরেও সেখান থেকে চলে না গিয়ে টাউনহলে যান বক্তব্য দিতে।
এরপর আর্চডিউক ও তার স্ত্রী টাউনহল থেকে বেরিয়ে আহত সঙ্গীদের দেখতে হাসপাতালের দিকে৷ কিন্তু তাদের গাড়িচালক একটা ভুল বাঁক নেয়। এটা বুঝতে পারে যখন গাড়িটা ঘুড়ানোর জন্য কয়েক সেকেন্ড থামানো হয়, ঠিক সেই সময় এক সার্বিয়ান জাতীয়তাবাদী গাভ্রিলো প্রিন্সিপ তাদের দিকে গুলি ছুড়ে। [১] [২] সঙ্গে সঙ্গে রাজদম্পতি নিহত হয়, আর তারপরেই শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো যে এত বিশাল ঘটনা ঘটে গেলেও, সেই অভিশপ্ত সবুজ গাড়িটার কাহিনী আজও থামেনি। সে তার চারদিকে ডেকে আনে খালি মৃত্যু আর মৃত্যু।
হত্যাকাণ্ডের পর গাড়িটা সেনাবাহিনীর কাছে থেকে যায়, এবং যুদ্ধের সময় বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এর প্রকৃত চাঞ্চল্য তৈরি হয় যুদ্ধ-পরবর্তী যুগে যখন এই গাড়ি নিয়ে অদ্ভুত, দুর্ভাগ্যময় বিভিন্ন কাহিনী ছড়াতে শুরু করে। [১] গাড়ির এক মালিক নাকি পাগল হয়ে গিয়েছিল, যার কারণে তাকে মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়। [৩] আরেক মালিক গাড়িটা চালাতে গিয়ে উল্টে গিয়ে মারা যায়। [১] আবার একদিন গাড়িটার ধাক্কায় দুজয় কৃষকও মারা যায়। [১]
সবচেয়ে আলোচিত কাহিনীটা এর শেষ মালিক সম্পর্কিত। জনশ্রুতি আছে যে তিনি গাড়িটা কিনেছিলেন এবং পরে ভেবে দেখেন, এই অভিশপ্ত যানের সর্বনাশা প্রভাব থেকে মুক্তি পেতে এটাকে জাদুঘরে দান করাই উত্তম। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় তিনি দুর্ঘটনায় মারা যান, সাথে প্রাণ হারান আরও চারজন। এরপর সেই গাড়িকে ভিয়েনার জাদুঘরে রাখা হলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সেখানে বোমাবর্ষণ করা হয়, যাতে করে পুরো জাদুঘরটাই মাটির সাথে মিশে যায়!
আসলেই কি কোনো অভিশাপ ছিল? এতগুলো ঘটনা কি সত্যিই কোনো অশুভ শক্তির ফল?
সত্য হলো যে গাড়িটা আজও আছে। ভিয়েনার সামরিক জাদুঘরের মূল আকর্ষণই এটা। সেখানে গেলে দেখতে পাওয়া যায় যে ফার্দিনান্দকে হত্যার দিনে ছোড়া গুলি আর বোমার চিহ্ন আজও দৃশমান। এটাই প্রমাণ করে যে প্রচলিত কাহিনীগুলো আসলে মানুষের বানানো। কেননা নাহলে আজ আমরা এই কিংবদন্তিকে নিজেদের চোখের সামনে দেখতে পেতাম না। সে যেন আমাদেরকে বলছে, “গুজবে কান দিও না। আমি আজও বেঁচে আছি।”
