১৮৫৩ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত — কে এই লুইস গারাভিটো?
পৃথিবীর ইতিহাসে এমন এক মানুষ, যার অপরাধ এত ভয়ঙ্কর যে তাকে ১৮৫৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল!1 হ্যাঁ, এক হাজার আটশো তিপ্পান্ন বছর।
১৯৯০ এর দশকে কলম্বিয়ার এই গ্রামগুলো ছিল একদিকে কুয়াসাময় রাতের মতো শান্ত, অন্যদিকে ভয়ঙ্কর। মানুষদের জীবন ছিল দারিদ্র্যতা আর পরিশ্রমে সীমাবদ্ধ। গ্রামগুলো ছিল সংঘাত, মাদক উৎপাদন আর আধাসামরিক গোষ্ঠীগুলোর প্রভাবের কারণে অত্যন্ত সহিংস আর অস্থিতিশীল। সরকার আর বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর লড়াইয়ে শত শত গণহত্যা এবং হাজার হাজার বেসামরিক মানুষের মৃত্যু ঘটে।
এরকম অবস্থায় ১৯৯৭ সালে গ্রামাঞ্চলে পরপর কয়েকজন শিশু নিখোঁজ হতে থাকে। স্থানীয়রা প্রথমে ভেবেছিল, হয়তো কোনো পাচারচক্রের কাজ। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই এক কৃষক তার খামারের পাশে কয়েকটা শিশুর কঙ্কাল দেখতে পায়। পুলিশ তদন্ত শুরু করে। একের পর এক কবর থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে ছোট ছোট হাড়ের স্তূপ।
এক লোক কখনও ভিক্ষুক সেজে, কখনও ধর্মপ্রচারকের বেশে পথের ধারে দরিদ্র ছেলেদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করত, মিষ্টি দিত, কখনও খেলনা, কাপড়, বা কাজের প্রলোভন দেখাত। বলত, “চলো, তোমায় এটা-ওটা কিনে দিই”। আর এরপর… নিরবে কোনো জায়গায় তাদের জীবনের প্রদীপ নিভে দিত। প্রতিটা হত্যাকাণ্ড ছিল পরিকল্পিত, নিখুঁত প্যাটার্ন বেঁধে রাখা। নির্যাতন, তারপর গলা কেটে হত্যা।
ঘটনা এখানেই থেমে থাকেনি। তদন্তকারীরা পরে আবিষ্কার করে এক ভয়ঙ্কর জিনিস। সেই খুনির নিজ হাতে আঁকা মানচিত্র! যেখানে লাল দাগে চিহ্ন দেওয়া ছিল তার শিকার ক্ষেত্রগুলো। প্রতিটা দাগের নিচে ছিল একেকটা শিশুর কবর, একেকটা হারানো শৈশব। কলম্বিয়ার ১১ টা প্রদেশে ছড়িয়ে ছিল তার এই ভয়ংকর নির্মমতা। 3
এসব শুরু হয়েছিল কলম্বিয়ার এক ছোট শহর জেনোভা তে, ১৯৫৭ সালে জন্ম নেওয়া এক শিশুর মধ্য দিয়ে! এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া শিশুটা প্রথম থেকেই সহিংসতার মধ্যে বড় হয়। তার বাবা ছিল মদ্যপ, অত্যাচারী আর মা ছিল অসহায়। ছোটবেলায় সে শিকার হয় বারবার শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের। 4
শৈশবের সেই অন্ধকারই হয়তো তার মনের ভেতর জন্ম দেয় এক ভয়ানক ছায়া—যা পরে বিকৃত রূপে ফেটে পড়ে সমাজের বিরুদ্ধে। বড় হয়ে সে আশেপাশের মানুষের চোখে রূপ নেয় নরম কণ্ঠের, হাসিখুশি, ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত এক ভদ্রলোক হিসাবে। যেন ভদ্র মুখোশে পিশাচ। কেউ ভাবতেও পারেনি এই মানুষটাই একদিন হবে ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম সিরিয়াল কিলার।
তদন্তে উঠে আসে ১৯৯২-১৯৯৯ সালে মাত্র সাত বছরে সে প্রায় ২০০-৩০০ শিশুকে হত্যা করে। ৮ থেকে ১৩ বছরের ছেলেরা ছিল তার মুল টার্গেট। একান্ত জায়গায় নিয়ে গিয়ে প্রথমে নির্যাতন, তারপর নির্মমভাবে হত্যা। অনেক সময় হত্যার পর শিকারদের দেহ বিকৃত করত, যেন কোনো শয়তানি রীতি পালন করছে।5
এখনো অবিশ্বাস্য যে একা এক ব্যক্তি এভাবে একটা অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে দিতে পারে ভয়ঙ্কর হত্যার ছায়া। যেখানে শীতল বাতাসে ভেসে আসত এক অদ্ভুত আতঙ্ক, যেন কেউ সবসময় পর্যবেক্ষণ করছে। পুলিশ প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেনি যে একজন মানুষ একা এতগুলো হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে। কিন্তু ডিএনএ আর সাক্ষ্য প্রমাণ সব একই দিকে ইঙ্গিত করে।6
খুনি প্রতিটা হত্যার পর কিছু না কিছু স্মৃতি রেখে দিত- বাসের টিকিট, কাপড়ের টুকরো, খেলনা বা ছোট নোট। এই সব জিনিস সে রেখে দিত কালো ব্যাগে, তার বোনের বাড়িতে।
১৯৯৮ সালে বুগা শহরের কাছে এক ছেলেকে হত্যা করে সে নেশার ঘোরে সিগারেট হাতে ঘুমিয়ে পড়ে। আগুনে নিজেও কিছুটা পুড়ে গিয়ে পালিয়ে বাঁচলেও পেছনে ফেলে আসে অপরাধের প্রমাণ। পুলিশ সেই সূত্র ধরে তার বোনের বাড়িতে পৌঁছে ব্যাগগুলো উদ্ধার করে।
অবশেষে ১৯৯৯ সালের এপ্রিল। এক কিশোর তার আক্রমণ থেকে বাঁচতে পালিয়ে গিয়ে পুলিশকে খবর দেয় আর ধরা পড়ে কলম্বিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দানব।
প্রথমে সে ভুয়া নাম ব্যবহার করেছিল, বোনিফাসিও মোরেরা। কিন্তু পুলিশের হাতে থাকা রেকর্ড মেলাতে দেরি হয়নি। ১৯৯৯ সালের ২ অক্টোবর তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা হয়। অবশেষে সে নিজের আসল পরিচয় প্রকাশ করে এবং এক এক করে দেখিয়ে দেয় সেইসব স্থানের মানচিত্র, যেখানে মাটির নিচে ঘুমিয়ে ছিল তার শত শত শিকার।
লুইদ আলফ্রেডো গারাভি
তার বিরুদ্ধে অন্তত ১৪০টা নিশ্চিত হত্যার মামলা প্রমাণিত হয়। যদিও তদন্তকারীরা অনুমান করে যে সে ৩০০-এর বেশি শিশুকে হত্যা করেছে।7
যদিও কলম্বিয়ার আইনে কেউ সর্বোচ্চ ৪০ বছর পর্যন্ত কারাগারে থাকতে পারে, তবুও ১৮৫৩ বছরের এই রায়টি ছিল প্রতীকী—মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধের প্রতিক্রিয়া হিসেবে। 8 গারাভিটো আজও এক রহস্য। কেউ বলে সে এক অসুস্থ মানুষ, মানসিকভাবে বিকৃত। কেউ বলে সে ছিল শয়তানের অবতার, যে মানুষ রুপে ঘুরে বেড়াত। তার কেসটা এখনো মনোবিজ্ঞান আর অপরাধবিদ্যার ক্লাসে আলোচিত হয়। কীভাবে এক নির্যাতিত শিশু একদিন হয়ে উঠে শিশু হত্যাকারী দানব। আর কীভাবে সমাজের চোখের সামনে লুকিয়ে থেকে সে বছরের পর বছর হত্যাকাণ্ড চালালো, অথচ কেউ কিছু টের পায়নি।
২০২৩ সালে গারাভিটো অসুস্থ হয়ে মারা যায়।
কলম্বিয়ার মানুষ আজও তার নাম উচ্চারণ করতে ভয় পায়। কারণ গারাভিটোর গল্পটা কেবল একজন খুনির গল্প নয়, এটা মানবতার গভীরতম অন্ধকারের গল্প। এটা সমাজের অভ্যন্তরে জন্ম নেয়া এক বিকৃত মস্তিষ্কের রক্তমাখা গল্প! যে গল্পে বলি হয়েছে অর্ধশতাধিক প্রাণ!
1 https://en.wikipedia.org/wiki/Luis_Garavito
2 https://www.britannica.com/biography/Luis-Garavito
4 https://www.eltiempo.com/archivo/documento/mam-954293
5 https://en.wikipedia.org/wiki/Luis_Garavito
7 https://en.wikipedia.org/wiki/Luis_Garavito
