১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর। থ্যাংকসগিভিংয়ের ঠিক আগের দিন বিকেল। আমেরিকার পোর্টল্যান্ড আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তখন উৎসবের আগের চেনা ব্যস্ততা- ঘরে ফেরার তাড়া, বাতাসে ভেসে বেড়ানো কফির গন্ধ আর লাগেজের চাকায় মিশে থাকা তাড়াহুড়োর শব্দ। সেই ভিড়ের মধ্যেই নিঃশব্দে এসে দাঁড়ালেন একজন লোক- বয়স চল্লিশের কোঠায়, মুখে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, চোখে নেই কোনো অস্বস্তি। নর্থওয়েস্ট এয়ারলাইন্সের ৩০৫ নম্বর ফ্লাইটের টিকেট কাটলেন। গন্তব্য ওয়াশিংটনের সিয়াটল। টিকেটে নাম লেখালেন - ড্যান কুপার।
এরপরের গল্পটা ইতিহাস। ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে রইলেন ডিবি কুপার নামে। একটা খবরের ভুল প্রচারের কারণে তিনি ডি বি কুপার পরিচিতি পান।
বিকেল তিনটার কিছু পর বোয়িং ৭২৭ রানওয়ে ছেড়ে আকাশে উঠে যায়। বিমানের পেছনের সারিতে ছিলেন কুপার। ওরেগনের পোর্টল্যান্ড এবং ওয়াশিংটনের সিয়াটলের মধ্যবর্তী আকাশসীমাতে উত্তর-পশ্চিম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিমান যখন ১০,০০০ ফুট উচ্চতায়, কুপার শান্তভাবে দুই গ্লাস ড্রিংক অর্ডার করেন। ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট ফ্লোরেন্স শেফনার যখন ড্রিংক নিয়ে আসেন, কুপার তার হাতে একটি ভাঁজ করা চিরকুট ধরিয়ে দেন এবং তাকে নিচু স্বরে বলে,
“পড়ে দেখুন। আতঙ্কিত হবেন না।”
চিরকুটে লেখা ছিল, "আমার কাছে বোমা আছে৷ আমি এই বিমানটা ছিনতাই করেছি।"
কুপার এরপর ধীর হাতে তার এটাচি কেস খোলেন। ভেতরে রাখা তার, ব্যাটারি আর বিস্ফোরকের সাজানো গাঁথুনি এক ঝলক দেখালেন।কোনো নাটকীয়তা নয়, শুধু নিশ্চিত প্রমাণ। সেই সময়ে, আজ থেকে প্রায় চুয়ান্ন বছর আগে, স্থানীয় বিমানযাত্রায় যাত্রীদের তল্লাশি বলতে প্রায় কিছুই ছিল না। টিকিট কেটে নির্দ্বিধায় বিমানে উঠে যাওয়া যেত। সেই ব্যবস্থার ফাঁক গলিয়েই কুপার বোমা নিয়ে উঠে এসেছিলেন আকাশে।
একেবারে স্পষ্ট করে তিনি জানান তাঁর শর্ত। সিয়াটলে অবতরণের পর তাঁকে দিতে হবে নগদ দুই লাখ ডলার। সঙ্গে থাকতে হবে দুটি ফ্রন্ট প্যারাস্যুট ও দুটি ব্যাক প্যারাস্যুট। বিমানবন্দরে প্রস্তুত রাখতে হবে ফুয়েল ট্রাক এবং কিছু খাবারও। কোনো দাবি বাড়তি নয়, কোনো শব্দও অপ্রয়োজনীয় নয়, সবকিছু যেন আগেই হিসেব করা।
সে সময় কুপারের চাওয়া অর্থের মূল্য আজকের দিনে প্রায় বারো লাখ ডলারেরও বেশি। তার দাবী ককপিট পর্যন্ত পৌঁছাতে দেরি হয় না । পাইলটরা সঙ্গে সঙ্গে নর্থওয়েস্ট এয়ারলাইন্সকে জানায়, এবং একই সঙ্গে বিষয়টি পৌঁছে যায় এফবিআইয়ের কানে। অথচ বিমানের ভেতরে বসে থাকা অন্য যাত্রীরা তখনো কিছুই জানত না। তারা অজান্তেই একটি চলমান সংকটের মাঝখানে ভেসে চলেছিল।
এফবিআই দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়। নির্দিষ্ট সিরিয়াল নম্বরযুক্ত ২০ ডলারের নোটে গঠিত দুই লাখ ডলার বিমানে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। যেন কুপার পালালেও তার ছাপ থেকে যায় টাকার ভাঁজে ভাঁজে। নিজের সব চাহিদা পূরণ হওয়ার পর কুপার একে একে সব যাত্রীকে ছেড়ে দেন। মুহূর্তের মধ্যেই একটি যাত্রীবাহী বিমান থেকে সরে যায় আতঙ্ক। কিন্তু থেকে যায় আরও গভীর, আরও ভয়ংকর এক অজানা অপেক্ষা।
ডলার আর প্যারাস্যুট হাতে পাওয়ার পর কুপার শান্ত গলায় পাইলটকে নির্দেশ দিলেন- গন্তব্য মেক্সিকো সিটি। কিন্তু কিছুক্ষণ আকাশে থাকার পর বাস্তবতা সামনে আসে। রাত নেমে যাচ্ছে, আবহাওয়া দ্রুত খারাপ হচ্ছে। পাইলট যুক্তি দেখালেন, এত ঝুঁকি না নিয়ে নেভাডার রেনোতে অবতরণ করাই নিরাপদ। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতার পর কুপার সম্মতি জানালেন। এই যাত্রাপথে তিনি সানগ্লাস পরে ছিলেন- অন্ধকারে যেন নিজের চোখকেও আড়াল করে রাখছিলেন।
বিমান দশ হাজার ফুটের নিচে রাখার নির্দেশ দেন। রুটের ব্যাপারে কোনো আপত্তি নেই; পাইলট নিজের সুবিধামতো পথ বেছে নিতে পারে। সেই সময় আকাশে আরেকটি অদৃশ্য নাটক চলছিল। এফবিআইয়ের দুটি বিমান বোয়িং ৭২৭-কে ছায়ার মতো অনুসরণ করছিল ।
রাত প্রায় আটটা। কুপার অ্যাটেনডেন্টকে ককপিটে চলে যেতে বলেন। যাওয়ার আগে অ্যাটেনডেন্ট দেখেন, কুপার ধীরে ধীরে ডলারের ব্যাগ আর প্যারাস্যুট নিজের শরীরে বেঁধে নিচ্ছেন। এর কিছুক্ষণ পরই ককপিটে সবাই টের পান, বিমানের পেছনের দরজাটা খুলে যাচ্ছে। মুহূর্তে ককপিট নিস্তব্ধ হয়ে যায়। কেউ কথা বলার সাহস পায় না। সবার মনে একটাই আশঙ্কা, কুপার কি এবার বোমাটি বিস্ফোরণ ঘটাবে?
কিন্তু বিস্ফোরণ হয়নি। কোনো শব্দ নয়, কোনো চিৎকার নয়, শুধু আকাশের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া এক মুহূর্ত।
রেনোতে অবতরণের পর পুলিশ ও এফবিআই বিমানটিকে ঘিরে ফেলে। তল্লাশি চালিয়ে তারা দেখে, পেছনের দরজাটি খোলা। চারটি প্যারাস্যুটের মধ্যে দুটি নিখোঁজ। কুপারের সিটে পড়ে আছে শুধু তার কালো টাই। আর কিছুই নেই।
ধারণা করা হয়, রাত আটটা থেকে আটটা দশ মিনিটের মধ্যে, যখন বিমানটি লুইস নদীর ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই আকাশে ঝাঁপ দিয়েছিলেন ডিবি কুপার। আশ্চর্যের বিষয়, তাকে অনুসরণ করা দুটি বিমানও সেই মুহূর্তটি টের পায়নি। না পাওয়া গেছে তার প্যারাস্যুট, না মাটিতে, না নদীর তলায়। তার লাশও কখনো উদ্ধার হয়নি।
তার নাম ছিল ভুয়া। পরিচয় ছিল ছায়ার মতো। বিমানে তার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সময় কাটানো অ্যাটেনডেন্ট ফ্লোরেন্স শেফনার ও টিনা মাকলোর বর্ণনা অনুযায়ী স্কেচ আঁকা হয়। কিন্তু স্কেচের মানুষটিও বাস্তবে ধরা দেয়নি। কুপার যেন সত্যিই বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছিলেন। একটা খোলা দরজা আর একটা পড়ে থাকা টাই ছাড়া আর কোনো প্রমাণ রেখে যাননি।
শুরু হয় তদন্ত। আমেরিকার সামরিক বাহিনী জঙ্গলে চিরুনি অভিযান চালিয়ে কেবল মুক্তিপণের কিছু ডলার উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। এফবিআই প্রায় ৮০০ সন্দেহভাজনকে তদন্ত করলেও কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পায়নি। কুপারের রেখে যাওয়া ক্লিপ-অন টাই ও কিছু মুক্তিপণের নোট পাওয়া গেলেও তার পরিচয় বা সে বেঁচে আছে কিনা তা আজও অমীমাংসিত। এই ঘটনাটি আমেরিকান ইতিহাসে একমাত্র অমীমাংসিত বাণিজ্যিক বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা হিসেবে আজও লোকমুখে প্রচলিত আছে। [1]
অনেক এফবিআই এজেন্টের অভিমত, "কুপার সম্ভবত অতো উঁচু থেকে ঝুঁকিপূর্ণ লাফ দিয়ে বাঁচতে পারেনি।" তবে তার দেহাবশেষ কখনই উদ্ধার করা যায়নি। ছিনতাইয়ের পরে এফবিআই ৪৫ বছর ধরে একটি সক্রিয় তদন্ত বজায় রেখেছিল। সেই সময়ের মধ্যে একটি মামলার ফাইল যা ৬০ টিরও বেশি খণ্ডে বেড়েছে। কুপারের আসল পরিচয় বা অবস্থান সম্পর্কে কোনও সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় নি। [1]
দীর্ঘ এফবিআই তদন্ত সত্ত্বেও, অপরাধী কখনও চিহ্নিত বা শনাক্ত করা যায়নি। তদন্তকারী, রিপোর্টার এবং অপেশাদার উৎসাহীদের দ্বারা বিগত বছরগুলিতে বিস্তৃতভাবে সম্ভব্য অসংখ্য তত্ত্বের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ১৯৮০ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটা ছোট ছেলে কলম্বিয়া নদীর তীরে একটা ছোট গুপ্ত ভাণ্ডার আবিষ্কার করেছিল। অনুসন্ধানটি নতুনভাবে আগ্রহের কারণ হয়ে উঠলেও শেষ পর্যন্ত কেবল রহস্যকে আরও গভীর করেছিল।
২০১৬ সালে এফবিআই আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত বন্ধ করে দেয়। এবং বাণিজ্যিক বিমান চলাচলের ইতিহাসে এটি এয়ার পাইরেসির একমাত্র অমীমাংসিত মামলা হিসেবে ফাইলের স্তুপে চাপা পড়ে যায়৷ আর ড্যান কুপার? ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়ে হয়তো সে ভালোই আছে তার নিজস্ব জগতে, তার নিজের মতো করে!
